আদুরে খালা বা আপা

আমাদের বাসায় যিনি ঘর মোছা আর কাপড় ধুয়ে দেওয়ার কাজটা করে দেন, তাকে আমরা ‘খালা’ বলে ডাকি। আমার বাচ্চারা উনাকে ডাকে ‘আপি’। বাচ্চারা খালাকে এতো পছন্দ করে যে, সকালবেলা খালা এসে দরোজায় নক করলে, তারা ‘আপি এসেছে’ ‘আপি এসেছে’ বলতে বলতে ভৌঁ-দৌঁড়ে ছুটে যায়। ছোটজন তো একলাফে কোলে উঠে পড়ে।

খালা আমাদের বিল্ডিংয়ের অন্য একটা ফ্লোরেও কাজ করেন৷ একদিনের ঘটনা। খালা পর পর দু’দিন কাজে আসতে পারেননি। অন্য যাদের বাসায় খালা কাজ করেন, সেই বাসার একটা ছোট ছেলে আমাদের বাসায় আসলো খালার খোঁজ নিতে৷ তাদের বাসায় তো যাচ্ছে না, আমাদের বাসায় আসে কী না জিগ্যেস করতে।

দরোজা খুলতেই ছেলেটা বলল, ‘আঙ্কেল, বুয়া কি এসেছে আপনাদের বাসায়?’

কেউ বাসায় এলে বা দরোজায় নক করলে, আমার মেয়ে দুটো এক দৌঁড়ে ছুটে দরোজার কাছে চলে আসে। লোকজনের আগমনের প্রতি তাদের অনন্ত কৌতূহল। সেদিন আমার বড় মেয়েও আমার পাশে দাঁড়ানো ছিল। নিচের ফ্ল্যাটের ছেলেটার মুখে শোনা ‘বুয়া’ শব্দটা মেয়ের মাথায় গেঁথে থাকে।

ছেলেটা চলে যাওয়ার পর মেয়ে জিগ্যেস করল, ‘আব্বু, বুয়া কে?’

আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। কারণ, আমরা সচেতনভাবেই মেয়েকে এই শব্দটার সাথে পরিচিত করাইনি। শব্দটা যদিও খারাপ কোনো শব্দ নয়, তথাপি মানুষ হিশেবে অন্য মানুষের প্রতি মমত্ব আর দয়ার জায়গা থেকে শব্দটাকে আমরা নিজেরাও চর্চা করিনি, বাচ্চাদেরও সচেতনভাবে শেখাইনি।

মেয়েকে বললাম, ‘তোমার আপির খোঁজ করতেই এসেছে। তোমার আপি যেমন আমাদের কাজ করে দেন, ওই বাসাতেও কিছু কাজ করেন।’

ভাগ্যিস যে, মেয়ে আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করেনি, আপিকে ছোট্ট ছেলেটা ‘বুয়া’ বলে ডাকল কেন!

মেয়ের স্কুলে যাওয়া-আসার পথে বেশ কয়েকজন গরিব মানুষের দেখা পাওয়া যায়৷ সাহায্য চায় হাত পেতে। সচরাচর এইসব মানুষগুলোকে বাচ্চার বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের কাছে কীভাবে বা কোন শব্দে পরিচিত করায়? ফকিরকে টাকা দাও, ভিক্ষুককে টাকা দাও—এভাবেই তো?

কিন্তু আমরা বাচ্চাদেরকে এইসব শব্দ শেখাইনি। এই লোকগুলোকে আমার মেয়েরা ‘অসহায় মানুষ’ বলেই চেনে। রোজ স্কুলে যাওয়ার পথে আমার বড় মেয়ের একটা রুটিন কাজ হলো—এইসব অসহায় মানুষগুলোকে নিজ হাতে টাকা দেওয়া। এই ধরণের মানুষ দেখা মাত্রই মেয়ে সটান দাঁড়িয়ে যায় আর বলে—‘আব্বু, টাকা দিন আমাকে। আমি ওই অসহায় মানুষটাকে দেবো।’

‘ফকির’ বা ’ভিক্ষুক’ কিন্তু খারাপ কোনো শব্দ নয়। তবে, এই শব্দগুলোতে সেই অ্যাম্পেথিটা ( সহানুভূতি ) অনুপস্থিত যা ‘অসহায়’ শব্দটার মাঝে রয়েছে। ফকির বা ভিক্ষুক শব্দগুলো শুনলে অপরপক্ষের প্রতি যতটা না দয়ার উদ্রেক হয়, তারচেয়ে বেশি মনে ঝেঁকে বসে তার দীনতার চিত্র।

ফলে, আমরা চেয়েছি, আমাদের সন্তানেরা এমনসব শব্দই শিখুক, যেগুলোর প্রায়োগিক অর্থ সুন্দর। যেগুলো মনে এলে মানুষের প্রতি তাদের সহানুভূতি জাগবে, মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়ার বদলে, কাছের কেউ মনে করবে। সর্বোপরি—মানুষের জন্য তাদের হৃদয়ে মমত্ববোধ, দয়ার উদ্রেক হবে, এমন শব্দগুলোকেই আমরা তাদের জন্য বেছে নিয়েছি।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাললাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে সুন্দর সুন্দর নামে ডাকতেন। মানুষকে সুন্দর সুন্দর নাম আর উপনাম দিতেন। কথা বলার জন্য, কাউকে ডাকার জন্য বা কাউকে বোঝানোর জন্য তিনি এমনসব শব্দ বেছে নিতেন যা সবচেয়ে সুন্দর আর মাধুর্যময়।

কাজের খালাকে আমার সন্তান ‘বুয়া’ ডাকলে, বা রাস্তার গরিব মানুষ, যারা সাহায্য চায় হাত পেতে, তাদেরকে ‘ফকির/ভিক্ষুক’ ডাকলেও উদ্দেশ্য সাধিত হয়। তবে, তারবিয়াহ মানে তো কেবল কাজের উদ্দেশ্য সাধিত করা নয়। অন্তরের ভালোবাসা, মমতা, দয়া আর সহানুভূতির জাগরণ ঘটানোই সন্তানের তারবিয়াহর অন্যতম লক্ষ্য।